ভারতীয় রাজনীতিতে এক চিরস্থায়ী রহস্য সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যু

Megna Tv

২১ ঘন্টা আগে মঙ্গলবার, আগস্ট ১১, ২০২৬


#
ছবি : সংগৃহীত

১৯৮০ সালের ২৩ জুন। নয়াদিল্লির সকাল ছিল স্বাভাবিক ও শান্ত। কিন্তু সেই সকালেই ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নেমে আসে এক গভীর ট্র্যাজেডি। ভারতের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কনিষ্ঠ পুত্র, কংগ্রেস নেতা সঞ্জয় গান্ধী মাত্র ৩৩ বছর বয়সে এক বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এই মৃত্যু শুধু একটি প্রভাবশালী পরিবারের ব্যক্তিগত শোকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ভারতীয় রাজনীতিতে রহস্য, বিতর্ক ও ষড়যন্ত্রের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের জন্ম দেয়।

সঞ্জয় গান্ধীর জীবন ছিল ক্ষমতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বিতর্কের সংমিশ্রণ। বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার আগে তিনি একাধিকবার হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছিলেন। ফলে তাঁর মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা ছিল নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে—সে প্রশ্ন আজও রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু।

রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও শৈশব

১৪ ডিসেম্বর ১৯৪৬ সালে সঞ্জয় গান্ধীর জন্ম ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারে। তাঁর প্রপিতামহ মতিলাল নেহরু ছিলেন স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা। নানা জওহরলাল নেহরু ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, আর মা ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ভাই রাজীব গান্ধীও পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হন। এই পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে সঞ্জয়কে ইন্দিরা গান্ধীর রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবেই দেখা হতো।

পড়াশোনায় খুব একটা মনোযোগী না হলেও প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। ইংল্যান্ডে রোলস-রয়েস প্রতিষ্ঠানে অটোমোটিভ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ১৯৭৬ সালে পাইলটের লাইসেন্স অর্জন করেন এবং অ্যারোবেটিক ফ্লাইটে দক্ষতা দেখান—যা পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনের জন্য মারাত্মক হয়ে ওঠে।

উইকিলিকস প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, ইন্দিরা গান্ধী নিজে কখনো সঞ্জয়কে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেখেননি। তবু জরুরি অবস্থার সময় তিনিই হয়ে ওঠেন ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন।

জরুরি অবস্থা ও বিতর্কিত ভূমিকা

১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে ইন্দিরা গান্ধী দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। নাগরিক অধিকার স্থগিত হয়, হাজার হাজার বিরোধী নেতা গ্রেপ্তার হন। এই সময়ে সঞ্জয় গান্ধী মায়ের প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকা নেন এবং কার্যত রাষ্ট্রক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রকে পরিণত হন।

তাঁর নেতৃত্বে চালু হয় ‘স্টপ অ্যাট টু’ জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে ৬০ লাখের বেশি পুরুষকে বন্ধ্যাকরণ করা হয়, যার বড় অংশই ছিল জোরপূর্বক। এই কর্মসূচি ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনার জন্ম দেয়।

এ ছাড়া দিল্লিসহ বিভিন্ন রাজ্যে বস্তি উচ্ছেদ অভিযান, তুর্কমান গেটের সহিংসতা এবং ব্যঙ্গাত্মক চলচ্চিত্র ‘কিসসা কুর্সি কা’ ধ্বংসের ঘটনায় তাঁর ভূমিকা সঞ্জয় গান্ধীকে এক বিতর্কিত রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত করে। এসব ঘটনার তদন্তে গঠিত শাহ কমিশন জরুরি অবস্থায় সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহারের কঠোর সমালোচনা করে।

ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন

১৯৭৭ সালের নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাচ্যুত হলেও ১৯৮০ সালে তিনি আবার বিপুল ভোটে ক্ষমতায় ফেরেন। সেই সঙ্গে সঞ্জয় গান্ধীও লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং দ্রুতই সংসদের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন হয়ে ওঠেন। মৃত্যুর মাত্র এক মাস আগে তিনি কংগ্রেসকে নয়টি রাজ্যের মধ্যে আটটিতে নির্বাচনী বিজয় এনে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

হত্যাচেষ্টা ও নিরাপত্তা শঙ্কা

রাজনৈতিক জীবনে সঞ্জয় গান্ধী অন্তত তিনবার হত্যাচেষ্টার শিকার হন। মার্কিন দূতাবাসের নথি অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এসব তথ্য দীর্ঘদিন গোপনই ছিল এবং কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তে প্রকাশ পায়নি।

সেই দুর্ঘটনাময় সকাল

২৩ জুন ১৯৮০, সকাল ৭টা ৪৮ মিনিটে সঞ্জয় গান্ধী সফদরজং বিমানবন্দরে পৌঁছান। কুর্তা-পায়জামা ও কোলাপুরি চপল পরা সঞ্জয় নিজের প্রিয় স্টান্ট বিমান পিটস এস–২এ-তে ওঠেন। সামনের আসনে ছিলেন প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেন সুভাষ সাক্সেনা। যদিও ওই বিমানে তাঁর উড়ানের অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট, তবু তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ নেন।

সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে বিমানটি উড্ডয়ন করে। মাত্র ১২ মিনিট পর, সকাল ৮টা ১০ মিনিটে, বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবনের কাছেই বিধ্বস্ত হয়। ঘটনাস্থলেই সঞ্জয় গান্ধী ও ক্যাপ্টেন সাক্সেনার মৃত্যু হয়।

শোক, প্রতিক্রিয়া ও ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ইন্দিরা গান্ধী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। কিন্তু সেখানে শুধু ধ্বংসস্তূপই ছিল। সঞ্জয়ের মৃত্যু তাঁকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে দেয়, যদিও তিনি তা প্রকাশ্যে দেখাননি।

এরপর শুরু হয় রাজনৈতিক বিতর্ক ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। কেউ কেউ বিমানে নাশকতার অভিযোগ তোলেন, আবার ২০১৮–১৯ সালে সুব্রামনিয়ান স্বামীর করা সোভিয়েত ষড়যন্ত্রের অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। এসব অভিযোগের কোনোটি আজও প্রমাণিত হয়নি।

উত্তরাধিকার ও প্রভাব

সঞ্জয় গান্ধীর অকালমৃত্যু ভারতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দেয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে রাজীব গান্ধী উঠে আসেন নেতৃত্বের কেন্দ্রে। মাত্র ৩৩ বছরের জীবনে সঞ্জয় গান্ধী যেমন ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন, তেমনি তাঁর মৃত্যু ভারতীয় রাজনীতিতে এক চিরস্থায়ী রহস্য হয়ে রয়ে গেছে।

একজন নেতার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি যে একটি দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে—সঞ্জয় গান্ধীর জীবন ও মৃত্যু তারই এক গভীর উদাহরণ।

তথ্যসূত্র: ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (ইউপিআই) আর্কাইভস, দ্য উইক ও এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা





ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন  

সর্বশেষ

#

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ভিসার এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট

#

টানা চতুর্থ দিনের মতো বিশ্ববাজারে বাড়ল স্বর্ণের দাম

#

পথ হারালে এই জাদুঘরেই খুঁজে নেব নতুন পথ: ড. ইউনূস

#

ফিলিস্তিনি বন্দিদের কারাগারে কুমির রাখার পরিকল্পনা স্থগিত করলেন ইসরায়েলি আদালত

#

‘জুলাই আন্দোলন কারও একার নয়, গণতন্ত্রকামী সবার অবদান’

#

স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তি স্থগিত করল ইতালি, মেলোনি-সানচেজের মধ্যে উত্তেজনা

#

গালাগালির অভিযোগ তুলে গভীর রাতে হঠাৎ মোদির ভিডিও বার্তা

#

বাংলাদেশ থেকে ৩ লাখ রোহিঙ্গা ফেরত নিতে রাজি মিয়ানমার

#

সৌদি সফর স্থগিত করলেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী

#

ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছে: ট্রাম্প

Link copied